১. তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদ) সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর
১. প্রশ্ন: ইসলামে আকীদা বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আকীদা হলো অন্তরের সুদৃঢ় বিশ্বাস। ইসলামি পরিভাষায়, আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতারা, কিতাবসমূহ, রাসুলগণ, পরকাল এবং ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি মনে-প্রাণে অবিচল বিশ্বাস রাখাকে আকীদা বলে।
২. প্রশ্ন: মানবজাতির সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য কী?
উত্তর: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। আল্লাহ বলেন: “আমি জিন এবং মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৬)।
৩. প্রশ্ন: আল্লাহর অধিকার বান্দার ওপর কী?
উত্তর: বান্দা কেবল আল্লাহরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কাউকে শরিক (অংশীদার) করবে না (সহীহ বুখারী)।
৪. প্রশ্ন: তাওহীদ শব্দের অর্থ কী এবং এটি কয় প্রকার?
উত্তর: তাওহীদ মানে আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলে বিশ্বাস করা। এটি প্রধানত ৩ প্রকার: তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে একত্ব), তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে একত্ব) এবং তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত (নাম ও গুণাবলীতে একত্ব)।
৫. প্রশ্ন: ‘তাওহীদুর রুবুবিয়্যাহ’ কী?
উত্তর: বিশ্বাস করা যে আল্লাহই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, মালিক, জীবন-মৃত্যু দাতা এবং মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক।
৬. প্রশ্ন: ‘তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ’ কী?
উত্তর: সমস্ত ইবাদত (যেমন: নামাজ, দোয়া, কোরবানি, মানত) একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত করা।
৭. প্রশ্ন: ‘তাওহীদুল আসমা ওয়াস-সিফাত’ কী?
উত্তর: পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদিসে আল্লাহর যেসব সুন্দর নাম ও গুণের কথা এসেছে, কোনো রকম বিকৃতি বা তুলনা ছাড়াই সেগুলোতে বিশ্বাস করা।
৮. প্রশ্ন: আল্লাহ তায়ালা কোথায় আছেন?
উত্তর: আল্লাহ তায়ালা তাঁর আরশের ওপর আছেন, তবে তিনি তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার মাধ্যমে সবকিছুর সাথে আছেন। আল্লাহ বলেন: “দয়াময় আল্লাহ আরশের ওপর সমাসীন।” (সূরা ত্বাহা: ৫)।
৯. প্রশ্ন: আল্লাহ কি সৃষ্টির কোনো কিছুর মতো?
উত্তর: না, আল্লাহ কোনো সৃষ্টির মতো নন। আল্লাহ বলেন: “কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” (সূরা আশ-শূরা: ১১)।
১০. প্রশ্ন: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ কী?
উত্তর: আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য (ইলাহ) নেই।
১১. প্রশ্ন: ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর রুকন বা ভিত্তি কয়টি?
উত্তর: ২টি। প্রথমত ‘লা ইলাহা’ দ্বারা সব মিথ্যা উপাস্যকে অস্বীকার করা, দ্বিতীয়ত ‘ইল্লাল্লাহ’ দ্বারা কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদত সাব্যস্ত করা।
১২. প্রশ্ন: ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ এর দাবি কী?
উত্তর: মহানবী (সা.) যা আদেশ করেছেন তা মানা, যা নিষেধ করেছেন তা বর্জন করা এবং তাঁর দেখানো তরিকা অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করা।
১৩. প্রশ্ন: আল্লাহ কি সরাসরি বান্দার দোয়া শোনেন, নাকি কোনো মাধ্যম লাগে?
উত্তর: আল্লাহ সরাসরি শোনেন। কোনো মাধ্যম বা উসিলার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ বলেন: “তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।” (সূরা গাফির: ৬০)।
১৪. প্রশ্ন: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে কসম বা শপথ করা কি জায়েজ?
উত্তর: না, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও নামে শপথ করা শিরক (সুনান আবু দাউদ)।
১৫. প্রশ্ন: ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত কয়টি ও কী কী?
উত্তর: ২টি। ১. ইখলাস (একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করা) এবং ২. মুতাবা’আত (রাসুলুল্লাহ সা. এর সুন্নাত অনুযায়ী হওয়া)।
২. শিরক, কুফর ও নিফাক (ঈমান পরিপন্থী বিষয়)
১৬. প্রশ্ন: সবচেয়ে বড় গুনাহ কোনটি?
উত্তর: আল্লাহর সাথে শিরক করা। আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয়ই শিরক চরম জুলুম।” (সূরা লোকমান: ১৩)।
১৭. প্রশ্ন: শিরক কাকে বলে?
উত্তর: আল্লাহর অধিকার, ক্ষমতা বা গুণাবলীতে অন্য কাউকে অংশীদার করা বা সমকক্ষ ভাবা।
১৮. প্রশ্ন: শিরক প্রধানত কত প্রকার?
উত্তর: ২ প্রকার। শিরকে আকবার (বড় শিরক) যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় এবং শিরকে আসগার (ছোট শিরক) যেমন: লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া)।
১৯. প্রশ্ন: আল্লাহ কি শিরকের গুনাহ ক্ষমা করেন?
উত্তর: তওবা না করে শিরকের ওপর মারা গেলে আল্লাহ তা কখনোই ক্ষমা করবেন না। তবে এর নিচের যেকোনো গুনাহ তিনি চাইলে ক্ষমা করতে পারেন (সূরা আন-নিসা: ৪৮)।
২০. প্রশ্ন: জ্যোতিষী বা গণকের কাছে ভাগ্য জানতে যাওয়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, গণকের কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে ৪০ দিনের নামাজ কবুল হয় না (সহীহ মুসলিম)। আর তার কথা বিশ্বাস করলে কোরআনকে অস্বীকার করা হয়।
২১. প্রশ্ন: তাবিজ, সুতা বা কড়ি ঝোলানো কি ইসলামে জায়েজ?
উত্তর: রোগমুক্তি বা নজর লাগা থেকে বাঁচার নিয়তে এগুলো ঝুলানো শিরক (মুসনাদে আহমাদ)। কুরিয়ার বা সুরক্ষার মালিক একমাত্র আল্লাহ।
২২. প্রশ্ন: কোনো পীর, মাজার বা অলির কাছে সন্তান বা রোগমুক্তি চাওয়া কি?
উত্তর: এটি স্পষ্ট ‘শিরকে আকবার’ বা বড় শিরক। কারণ দেওয়ার মালিক একমাত্র আল্লাহ।
২৩. প্রশ্ন: কুফর কাকে বলে?
উত্তর: ইসলামের মৌলিক কোনো বিশ্বাস বা বিধানকে অস্বীকার করা বা অমান্য করা।
২৪. প্রশ্ন: নিফাক বা মুনাফেকি কী?
উত্তর: মুখে মুখে ইসলামের প্রকাশ করা কিন্তু অন্তরে কুফরি বা অবিশ্বাস লুকিয়ে রাখা।
২৫. প্রশ্ন: মুনাফিকের আলামত বা লক্ষণ কয়টি?
উত্তর: প্রধানত ৩টি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখলে খেয়ানত করে (সহীহ বুখারী)।
৩. ফেরেশতাকুল ও আসমানি কিতাব সম্পর্কিত
২৬. প্রশ্ন: ফেরেশতারা কিসের তৈরি?
উত্তর: ফেরেশতারা নূরের (আলোর) তৈরি (সহীহ মুসলিম)।
২৭. প্রশ্ন: ফেরেশতাদের কি পুরুষ বা নারীবাচক লিঙ্গ আছে?
উত্তর: না, ফেরেশতাদের কোনো লিঙ্গ নেই। তারা আল্লাহর অবাধ্য হন না, বরং তাঁর আদেশ পালন করেন।
২৮. প্রশ্ন: প্রধান চারজন ফেরেশতার নাম কী?
উত্তর: জিবরাঈল, মিকাঈল, ইসরাফীল এবং আজরাঈল (যাঁর উপাধি মালাকুল মাউত বা মৃত্যুর ফেরেশতা)।
২৯. প্রশ্ন: ওহী নিয়ে আসতেন কোন ফেরেশতা?
উত্তর: হযরত জিবরাঈল (আ.)।
৩০. প্রশ্ন: আসমানি কিতাব বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মানবজাতির হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসুলদের ওপর যেসব কিতাব নাজিল করেছেন।
৩১. প্রশ্ন: প্রধান ৪টি আসমানি কিতাব কী কী এবং কার ওপর নাজিল হয়েছিল?
উত্তর: তাওরাত (হযরত মুসা আ.), জাবুর (হযরত দাউদ আ.), ইঞ্জিল (হযরত ঈসা আ.) এবং ফোরকান বা কোরআন (হযরত মুহাম্মদ সা.)।
৩২. প্রশ্ন: পবিত্র কোরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব কার?
উত্তর: স্বয়ং আল্লাহ তায়ালার। আল্লাহ বলেন: “আমিই কোরআন অবতীর্ণ করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষক।” (সূরা আল-হিজর: ৯)।
৩৩. প্রশ্ন: কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার পর পূর্ববর্তী কিতাবগুলোর বিধানের কী অবস্থা?
উত্তর: কোরআন নাজিল হওয়ার পর পূর্বের সব কিতাবের বিধান রহিত (বাতিল) হয়ে গেছে। এখন শুধু কোরআনের বিধানই পালনীয়।
৪. নবী ও রাসুলগণ সম্পর্কিত
৩৪. প্রশ্ন: ‘নবী’ ও ‘রাসুল’ এর মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: রাসুল হলেন তিনি, যাঁকে আল্লাহ নতুন শরিয়ত ও কিতাব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর নবী হলেন তিনি, যিনি পূর্ববর্তী রাসুলের শরিয়ত প্রচার করতেন। (প্রত্যেক রাসুলই নবী, কিন্তু প্রত্যেক নবী রাসুল নন)।
৩৫. প্রশ্ন: প্রথম ও শেষ নবীর নাম কী?
উত্তর: প্রথম নবী হযরত আদম (আ.) এবং সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
৩৬. প্রশ্ন: মুহাম্মদ (সা.) এর পর কি আর কোনো নবী আসবে?
উত্তর: না, তিনি খাতামুন্নাবিইয়ীন বা শেষ নবী। তাঁর পর কেউ নবুয়তের দাবি করলে সে কাজ্জাব বা চরম মিথ্যাবাদী।
৩৭. প্রশ্ন: ‘উলুল আযম’ বা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ রাসুল কয়জন ও কারা?
উত্তর: ৫ জন। হযরত নোফ (আ.), হযরত ইব্রাহিম (আ.), হযরত মুসা (আ.), হযরত ঈসা (আ.) এবং হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
৩৮. প্রশ্ন: সর্বশ্রেষ্ঠ মানব কে?
উত্তর: আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
৩৯. প্রশ্ন: সকল নবী-রাসুলের মূল দাওয়াত কী ছিল?
উত্তর: এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাগুত (মিথ্যা উপাস্য) বর্জন করা (সূরা আন-নাহল: ৩৬)।
৪০. প্রশ্ন: নবীগণ কি নিষ্পাপ (মাসুম)?
উত্তর: হ্যাঁ, নবুয়তের দায়িত্ব পালন ও শরিয়তের বিধিবিধান প্রচারের ক্ষেত্রে সকল নবী-রাসুল সম্পূর্ণ নিষ্পাপ।
৪১. প্রশ্ন: মিরাজ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে ঊর্ধ্বাকাশে আল্লাহর দিদার লাভের অলৌকিক ভ্রমণ।
৪২. প্রশ্ন: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মিরাজ কি সশরীরে হয়েছিল নাকি স্বপ্নে?
উত্তর: আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদা অনুযায়ী মিরাজ সশরীরে জাগ্রত অবস্থায় হয়েছিল।
৫. আখেরাত, কবর ও কেয়ামত সম্পর্কিত
৪৩. প্রশ্ন: কবরের প্রথম তিনটি প্রশ্ন ও তার উত্তর কী?
উত্তর: ১. মান রাব্বুকা? (তোমার রব কে?) – উত্তর: রাব্বিয়াল্লাহ (আমার রব আল্লাহ)। ২. মা দ্বীনুকা? (তোমার দ্বীন কী?) – উত্তর: দ্বীনিয়াল ইসলাম (আমার দ্বীন ইসলাম)। ৩. মান হাযার রাজুল? (এই ব্যক্তিটি কে?) – উত্তর: হুয়া রাসুলুল্লাহ (তিনি আল্লাহর রাসুল)।
৪৪. প্রশ্ন: কবরে কি শাস্তি বা শান্তি সত্য?
উত্তর: হ্যাঁ, কোরআন ও সহীহ হাদিস দ্বারা কবরের আজাব এবং শান্তি প্রমাণিত ও সত্য।
input: ৪৫. প্রশ্ন: কেয়ামতের বড় বড় লক্ষণ কয়টি?
উত্তর: ১০টি। (যেমন: দাজ্জালের আগমন, ঈসা আ. এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজের বের হওয়া, পশ্চিম দিগন্ত থেকে সূর্য উদিত হওয়া ইত্যাদি)।
৪৬. প্রশ্ন: দাজ্জাল কে?
উত্তর: কেয়ামতের পূর্বে আগমনকারী এক চরম মিথ্যাবাদী ফিতনা, যে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করবে। তার এক চোখ কানা থাকবে।
৪৭. প্রশ্ন: দাজ্জালকে কে হত্যা করবেন?
উত্তর: হযরত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে অবতীর্ণ হয়ে দাজ্জালকে লুদ নামক স্থানে হত্যা করবেন।
৪৮. প্রশ্ন: কেয়ামতের দিন প্রথম কোন বিষয়ের হিসাব নেওয়া হবে?
উত্তর: বান্দার সালাত বা নামাজের (সুনান আন-নাসায়ী)।
৪৯. প্রশ্ন: ‘মিযান’ কী?
উত্তর: কেয়ামতের মাঠে মানুষের ভালো ও মন্দ আমল পরিমাপ করার ন্যায়বিচারের পাল্লা।
৫০. প্রশ্ন: ‘হাওযে কাউসার’ কী?
উত্তর: কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা নবীজি (সা.)-কে একটি পানির আধার দান করবেন, যার পানি দুধের চেয়ে সাদা এবং মধুর চেয়ে মিষ্টি। সেখান থেকে একবার পান করলে আর কখনো তৃষ্ণা পাবে না।
৫১. প্রশ্ন: ‘পুলসিরাত’ কী?
উত্তর: জাহান্নামের ওপর স্থাপিত একটি সেতু, যা চুলের চেয়ে সূক্ষ্ম এবং তলোয়ারের চেয়ে ধারালো। মানুষের আমল অনুযায়ী তারা এটি পার হবে।
৫২. প্রশ্ন: জান্নাত ও জাহান্নাম কি এখন বিদ্যমান আছে?
উত্তর: হ্যাঁ, জান্নাত ও জাহান্নাম বর্তমানে তৈরি অবস্থায় বিদ্যমান আছে এবং তা চিরস্থায়ী।
৫৩. প্রশ্ন: জান্নাতিদের জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত কী হবে?
উত্তর: কোনো পর্দা ছাড়াই মহান আল্লাহ তায়ালার দিদার বা দর্শন লাভ করা (সূরা আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩)।
৫৪. প্রশ্ন: সুপারিশ বা ‘শাফায়াত’ করার অধিকার কার থাকবে?
উত্তর: আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে নবী-রাসুল, নেককার বান্দা এবং কোরআন-রোজা সুপারিশ করতে পারবে। সবচেয়ে বড় শাফায়াত করবেন নবীজি (সা.)।
৬. তাকদীর বা ভাগ্য সম্পর্কিত
৫৫. প্রশ্ন: তাকদীর বা ভাগ্য বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটবে, আল্লাহ তায়ালা তা সৃষ্টির পূর্বেই তাঁর অসীম জ্ঞানে জেনে রেখেছেন এবং লিখে রেখেছেন—এই বিশ্বাস রাখা।
৫৬. প্রশ্ন: তাকদীরের ভালো-মন্দের স্রষ্টা কে?
উত্তর: ভালো এবং মন্দ সবকিছুরই স্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা। তবে আল্লাহ মন্দের প্রতি সন্তুষ্ট নন।
৫৭. প্রশ্ন: সৃষ্টির ভাগ্য কখন লেখা হয়েছে?
উত্তর: আসমান ও জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ তায়ালা লওহে মাহফুজে ভাগ্য লিখে রেখেছেন (সহীহ মুসলিম)।
৫৮. প্রশ্ন: মানুষ কি কাজ করতে বাধ্য, নাকি তার ইচ্ছা স্বাধীনতা আছে?
উত্তর: মানুষের সীমিত পরিসরে ইচ্ছা ও কর্মের স্বাধীনতা আছে, যার ভালো-মন্দের জন্য সে নিজে দায়ী। তবে মানুষের এই ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছার অধীন।
৫৯. প্রশ্ন: দোয়া কি ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দোয়া ভাগ্য পরিবর্তন বা ঝুলন্ত তাকদীর ও বিপদ দূর করতে পারে (জামে আত-তিরমিযী)।
৭. ঈমান, আসহাব (সাহাবি) ও আহলে বাইত
৬০. প্রশ্ন: ঈমান শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকার করা এবং কাজে পরিণত করা।
৬১. প্রশ্ন: ঈমান কি বাড়ে ও কমে?
উত্তর: হ্যাঁ, নেক আমল বা ভালো কাজের মাধ্যমে ঈমান বাড়ে এবং গুনাহের কাজের মাধ্যমে ঈমান কমে।
৬২. প্রশ্ন: কবিরা গুনাহ (বড় পাপ) করলে কি মানুষ কাফের হয়ে যায়?
উত্তর: না, আহলুস সুন্নাহর মতে কবিরা গুনাহকারী কাফের হয় না, বরং সে ফাসেক বা অবাধ্য মুমিন হিসেবে গণ্য হয়। আল্লাহ চাইলে তাকে ক্ষমা করতে পারেন বা শাস্তি দিয়ে জান্নাতে দিতে পারেন।
৬৩. প্রশ্ন: সাহাবি (রা.) কাদের বলা হয়?
উত্তর: যাঁরা ঈমানের সাথে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং ঈমানের সাথেই মৃত্যুবরণ করেছেন।
৬৪. প্রশ্ন: সাহাবিদের ব্যাপারে একজন মুসলিমের আকীদা কেমন হওয়া উচিত?
উত্তর: সকল সাহাবিকে ভালোবাসা ফরজ। তাঁদের সমালোচনা বা গালিগালাজ করা সম্পূর্ণ হারাম। তাঁরা সবাই ন্যায়পরায়ণ ছিলেন।
৬৫. প্রশ্ন: সাহাবিদের মধ্যে পুরুষদের মাঝে প্রথম কে ঈমান আনেন?
উত্তর: হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
৬৬. প্রশ্ন: খুলাফায়ে রাশেদীন (চার খলিফা) এর মর্যাদার ক্রম কীরূপ?
উত্তর: মর্যাদার ক্রম খিলাফতের দায়িত্বের মতোই: ১. আবু বকর, ২. উমর, ৩. উসমান এবং ৪. আলী (রা.)।
৬৭. প্রশ্ন: ‘আহলে বাইত’ কারা?
উত্তর: রাসুলুল্লাহ (সা.) এর পরিবারবর্গ, স্ত্রীগণ এবং তাঁর বংশের মুমিন সদস্যগণ। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রাখা ঈমানের অংশ।
৮. বিদআত, অস্পৃশ্য জ্ঞান ও কারামত
৬৮. প্রশ্ন: বিদআত কাকে বলে?
উত্তর: দ্বীনের মধ্যে সওয়াবের নিয়তে এমন নতুন প্রথা বা ইবাদত তৈরি করা, যার কোনো ভিত্তি কোরআন ও হাদিসে নেই।
৬৯. প্রশ্ন: বিদআতের পরিণাম কী?
উত্তর: প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী বা পথভ্রষ্টতা এবং তা আমলকারীকে জাহান্নামে নিয়ে যায় (সুনান নাসায়ী)।
৭০. প্রশ্ন: অলির ‘কারামত’ কি সত্য?
উত্তর: হ্যাঁ, আল্লাহর নেককার বান্দাদের (অলি) মাধ্যমে অলৌকিক কিছু প্রকাশ পাওয়া সত্য, যদি তা শরিয়তের পরিপন্থী না হয়।
৭১. প্রশ্ন: কারামত ও মুজিযার মধ্যে পার্থক্য কী?
উত্তর: নবীদের মাধ্যমে অলৌকিক কিছু ঘটলে তা ‘মুজিযা’, আর অলির মাধ্যমে ঘটলে তা ‘কারামত’।
৭২. প্রশ্ন: গায়েবের (অদৃশ্য) জ্ঞান কে জানেন?
উত্তর: একমাত্র আল্লাহ তায়ালা গায়েবের সম্পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। আল্লাহ যতটুকু জানান, নবীগণ ততটুকুই জানতে পারেন।
৯. কোরআন ও হাদিস থেকে নির্বাচিত ৩০টি আকীদাভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
৭৩. প্রশ্ন: আল্লাহ তায়ালা কি ঘুমান বা তন্দ্রাচ্ছন্ন হন?
উত্তর: না, আল্লাহ তায়ালা তন্দ্রা ও নিদ্রা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র (সূরা আল-বাকারাহ: ২৫৫)।
৭৪. প্রশ্ন: জিন জাতি কিসের তৈরি?
উত্তর: জিন জাতি ধোঁয়াহীন আগুনের শিখা থেকে তৈরি (সূরা আর-রহমান: ১৫)।
৭৫. প্রশ্ন: মানুষ কিসের তৈরি?
উত্তর: মানুষ বা আদম (আ.) মাটি থেকে তৈরি।
৭৬. প্রশ্ন: ইবলিশ বা শয়তান কি ফেরেশতা ছিল?
উত্তর: না, ইবলিশ জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল, সে অহংকারবশত আল্লাহর অবাধ্য হয় (সূরা আল-কাহাফ: ৫০)।
৭৭. প্রশ্ন: উসিলা ধরা কি জায়েজ?
উত্তর: আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম, নিজের নেক আমল এবং জীবিত কোনো নেককার ব্যক্তির দোয়ার মাধ্যমে উসিলা ধরা জায়েজ। মৃত ব্যক্তির নামে উসিলা ধরা জায়েজ নয়।
৭৮. প্রশ্ন: কোন পাপের কারণে মানুষ চিরস্থায়ী জাহান্নামী হয়?
উত্তর: শিরক ও কুফরের ওপর মৃত্যুবরণ করলে।
৭৯. প্রশ্ন: ইসলাম ভঙ্গের প্রধান কারণ কয়টি?
উত্তর: ১০টি (যেমন: শিরক করা, আল্লাহ ও নিজের মাঝে মাধ্যম ধরা, জাদুটোনা করা ইত্যাদি)।
৮০. প্রশ্ন: আল্লাহ তায়ালা মানুষের অন্তরের খবর কি জানেন?
উত্তর: হ্যাঁ, আল্লাহ মানুষের অন্তরের গোপনতম ইচ্ছার খবরও জানেন (সূরা মুলক: ১৩)।
৮১. প্রশ্ন: কবরের আজাব থেকে বাঁচার জন্য কোন সূরা নিয়মিত পড়ার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: সূরা আল-মুলক (৬৭ নম্বর সূরা)।
৮২. প্রশ্ন: মুসলিমদের কি একে অপরকে কাফের বলা উচিত?
উত্তর: না, কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে কাফের বললে সেই কুফরি নিজের দিকে ফিরে আসার ভয় থাকে (সহীহ বুখারী)।
৮৩. প্রশ্ন: রিয়া বা লোকদেখানো ইবাদত করলে কী ক্ষতি হয়?
উত্তর: সেই ইবাদত বাতিল হয়ে যায় এবং এটি একটি ছোট শিরক।
৮৪. প্রশ্ন: আল্লাহ কি তওবা কবুল করেন?
উত্তর: মৃত্যুর গড়গড়া (নৈরাশ্যের মুহূর্ত) শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এবং পশ্চিম দিক থেকে সূর্য ওঠার আগে খাঁটি তওবা আল্লাহ কবুল করেন।
৮৫. প্রশ্ন: ‘তাগুত’ শব্দের অর্থ কী?
উত্তর: আল্লাহকে বাদ দিয়ে যার ইবাদত বা আনুগত্য করা হয় এবং সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে।
৮৬. প্রশ্ন: রুকইয়াহ কী?
উত্তর: কোরআনের আয়াত বা হাদিসের দোয়া দ্বারা ঝাড়ফুঁক করা। এটি জায়েজ এবং সুন্নাত।
৮৭. প্রশ্ন: ইসলামে জাদুর বিধান কী?
উত্তর: জাদু করা বা জাদু শেখা কুফরি এবং কবিরা গুনাহ।
৮৮. প্রশ্ন: প্রথম রাসুল কে ছিলেন?
উত্তর: হযরত নূহ (আ.) ছিলেন পৃথিবীর প্রথম রাসুল (সহীহ বুখারী)।
৮৯. প্রশ্ন: মৃত্যুর ফেরেশতার নাম কোরআনে কী বলা হয়েছে?
উত্তর: ‘ملك الموت’ বা মালাকুল মাউত (সূরা আস-সাজদাহ: ১১)।
৯০. প্রশ্ন: কেয়ামতের দিন প্রথম কার কবর উন্মোচন করা হবে?
উত্তর: হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর (সহীহ মুসলিম)।
৯১. প্রশ্ন: ‘আল-আসমাউল হুসনা’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নামসমূহ। হাদিসে এসেছে আল্লাহর এমন ৯৯টি নাম আছে।
৯২. প্রশ্ন: আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সেজদা করা কি জায়েজ?
উত্তর: না, সেজদা পাওয়ার একমাত্র যোগ্য আল্লাহ। সম্মানসূচক সেজদা করাও ইসলামে হারাম।
৯৩. প্রশ্ন: পশু পাখি বা জীবজন্তুর ছবি বা মূর্তি ঘরে রাখার বিধান কী?
উত্তর: রহমতের ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করে না যেখানে ছবি বা মূর্তি থাকে (সহীহ বুখারী)।
৯৪. প্রশ্ন: ভাগ্য গণনার জন্য রাশিফল দেখা কি জায়েজ?
উত্তর: না, পেপার বা অনলাইনে রাশিফল পড়া বা বিশ্বাস করা গুনাহ ও আকীদা পরিপন্থী।
৯৫. প্রশ্ন: ‘ইসলাম’, ‘ঈমান’ ও ‘ইহসান’ এর মধ্যে শ্রেষ্ঠ স্তর কোনটি?
উত্তর: ইহসান। এর অর্থ হলো এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করা যেন তুমি আল্লাহকে দেখছ, আর তা না হলে বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।
৯৬. প্রশ্ন: মুমিনদের জন্য পরকালে আল্লাহর রাসুল (সা.) এর হাউজের পানি পানের ব্যবস্থা কোথায় হবে?
উত্তর: হাশরের ময়দানে, পুলসিরাত পার হওয়ার পূর্বে।
৯৭. প্রশ্ন: কোন ব্যক্তি কি নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে যেতে পারবে?
উত্তর: না, কেউই কেবল নিজের আমল দিয়ে জান্নাতে যাবে না, যতক্ষণ না আল্লাহর দয়া ও রহমত তার ওপর বর্ষিত হয় (সহীহ বুখারী)।
৯৮. প্রশ্ন: কোরআন কি আল্লাহর সৃষ্টি নাকি আল্লাহর বাণী?
উত্তর: কোরআন আল্লাহর বাণী (কালামুল্লাহ), এটি সৃষ্টি (মাখলুক) নয়।
৯৯. প্রশ্ন: হাশরের মাঠে মানুষ কার নামের সাথে উত্থিত হবে?
উত্তর: মানুষ তার নিজের নাম এবং পিতার নামের সাথে আহূত হবে (সুনান আবু দাউদ)।
১০০. প্রশ্ন: সঠিক আকীদা চেনার মূল উৎস বা মাপকাঠি কী?
উত্তর: পবিত্র কোরআন, সহীহ হাদিস এবং সাহাবিদের (সালাফদের) বুঝ ও আমল।
